• বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

বিবেক নিভে গেলে শয়তান সঙ্গী হয়

Reporter Name: Ibrahim ShoheL / ২২৬ Time View
Update : শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬


মহামায়া আয়ুমী বাহাদুর, (ইংল্যান্ড)
— কুরআনের নিয়মের গভীর বিজ্ঞান
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
“যে রহমানের স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়— আমরা তার জন্য এক শয়তান নির্ধারণ করে দিই, ফলে সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৩৬)


মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর বিপর্যয় তখনই শুরু হয়, যখন সে ভুল পথে থেকেও মনে করে— সে ঠিক পথেই আছে। অন্ধকারে চলা যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হলো অন্ধকারকে আলো মনে করা। কারণ তখন মানুষ নিজেকে সংশোধনের প্রয়োজনই অনুভব করে না। নিজের অবস্থান নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকে, আত্মবিশ্বাসী থাকে, এমনকি অহংকারী হয়ে ওঠে। এই আত্মতুষ্টিই ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে নিভিয়ে দেয়।


কুরআনের ৪৩:৩৬ নম্বর আয়াতটি এই গভীর ও ভয়ংকর বাস্তবতার দিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আয়াতটি শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, চিন্তার গঠন এবং আচরণগত পরিণতির এক নিখুঁত বিশ্লেষণ। এই আয়াতকে যদি হালকাভাবে পড়া হয়, তাহলে মনে হতে পারে— আল্লাহ যেন মানুষকে জোর করে পথভ্রষ্ট করে দেন। কিন্তু আয়াতের শব্দচয়ন, বাক্যগঠন এবং কুরআনের সামগ্রিক দর্শনের আলোকে বিচার করলে বোঝা যায়— এখানে কোনো জোর নেই, কোনো স্বেচ্ছাচারিতা নেই। এখানে রয়েছেঘ কারণ ও ফলাফলের এক অবিচল নিয়ম, যা আল্লাহ নিজেই স্থাপন করেছেন।


আয়াতটির শুরুতেই যে শব্দবন্ধটি এসেছে, তা পুরো বক্তব্যের ভিত্তি—
“যে মুখ ফিরিয়ে নেয়”।
এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছেন— বিচ্যুতির সূচনা মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত থেকেই হয়। আল্লাহ বলেননি— “যাকে আমি ইচ্ছামতো কুরআন থেকে সরিয়ে দিই।” বরং তিনি বলেছেন— যে নিজেই রহমানের স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।


এটি একটি মৌলিক নীতি। মানুষকে আল্লাহ চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন, পছন্দ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করেই মানুষ আলো থেকে দূরে সরে যায়। আর আলো থেকে সরে গেলে অন্ধকার আসবেই— এটি কোনো শাস্তি নয়, এটি স্বাভাবিক পরিণতি।


এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণই যথেষ্ট। ধরুন, একটি ঘরের সব দরজা ও জানালা বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর ঘর অন্ধকার হয়ে যাবে। এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে— “ঘরটা অন্ধকার কেন?”— তাহলে কি উত্তর হবে? কেউ কি বলবে— আলো ইচ্ছা করে ঢোকেনি? না। উত্তর হবে— আলো ঢোকার পথ বন্ধ করা হয়েছে। অন্ধকার এখানে কোনো আক্রমণ নয়; এটি অনুপস্থিতির ফল।


ঠিক তেমনি— কুরআন মানুষের জীবনের আলো। এটি শুধু ইবাদতের বই নয়; এটি নৈতিকতা, চিন্তা, সমাজ ও সিদ্ধান্তের আলো। মানুষ যখন এই আলোকে জীবনের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়, তখন তার অন্তরে শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাই ধীরে ধীরে অন্ধকারে ভরে যায়।
কুরআনের ভাষায় এই অন্ধকারকে বলা হয়েছে— শয়তান।


এখানে শয়তান বলতে কেবল আগুনে তৈরি কোনো অদৃশ্য সত্তাকেই বোঝানো হয়নি। কুরআনের ব্যবহারে “শয়তান” একটি বিস্তৃত ধারণা। সত্য থেকে সরিয়ে দেয়— এমন সবকিছুই শয়তানি। এটি হতে পারে চিন্তা, প্রবণতা, মতবাদ কিংবা অভ্যাস।
শয়তান হতে পারে—
ভুল যুক্তিকে আঁকড়ে ধরা,
নিজের মতকে প্রশ্নাতীত মনে করা,
অহংকারকে বুদ্ধিমত্তা ভাবা,
মানুষের কথা কুরআনের ওপরে বসানো,
অন্ধ অনুসরণকে ধর্মীয় আনুগত্য মনে করা,
সত্যের সামনে এসে তা অস্বীকার করার মানসিকতা।
এই সবকিছু একত্রে মানুষের ভেতরে এক ধরনের বিকৃতি সৃষ্টি করে। এই বিকৃতি বাইরে থেকে এসে জোর করে বসে না। এটি জন্ম নেয় অবহেলার ভেতর দিয়ে, যেমন লোহার ওপর মরিচা ধরে।


লোহা যদি নিয়মিত ব্যবহার করা হয়, পরিচর্যা করা হয়, তাহলে তাতে মরিচা ধরে না। কিন্তু লোহাকে যদি ফেলে রাখা হয়, অবহেলা করা হয়, তাহলে তার ওপর মরিচা জমে। এই মরিচা বাইরে থেকে আক্রমণ করে না; এটি লোহার অব্যবহারের স্বাভাবিক ফল।
ঠিক তেমনি— হৃদয় যদি কুরআনের আলো থেকে দূরে থাকে, সেখানে বিকৃতি জন্ম নেয়। এই বিকৃতিকেই আল্লাহ বলেছেন— “আমি তার জন্য এক শয়তান নির্ধারণ করে দিই।”


আয়াতে বলা হয়েছে—
“ফলে সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।”
এখানে “সঙ্গী” শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। সঙ্গী মানে এমন কেউ, যে সবসময় পাশে থাকে, সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে, চিন্তাকে গঠন করে। কোনো কিছু হঠাৎ করে সঙ্গী হয়ে যায় না। বারবার গ্রহণ করতে করতে, তাকে জায়গা দিতে দিতে— সে সঙ্গী হয়ে ওঠে।
মানুষ যদি প্রতিদিন ভুল চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়, একসময় সেই ভুলই তার স্বাভাবিক চিন্তাধারা হয়ে যায়।
মানুষ যদি বারবার সত্যকে এড়িয়ে চলে, একসময় সত্য তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।


মানুষ যদি বারবার নিজের মতকে প্রাধান্য দেয়, একসময় সে আর কোনো সংশোধন গ্রহণ করতে পারে না।
এই পর্যায়ে পৌঁছে মানুষ সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থায় পড়ে— সে ভুল পথে থেকেও দৃঢ় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে ঠিক পথেই আছে।
কুরআন এই মানসিক অবস্থাকে অন্য আয়াতে এভাবে বর্ণনা করেছে—
“তারা মনে করে, তারা সঠিক পথেই রয়েছে।”


এটি আত্মপ্রতারণার চূড়ান্ত রূপ। মানুষ নিজের ভুলকে আর ভুল মনে করে না। বরং সে ভুলের পক্ষে যুক্তি খোঁজে, দলিল তৈরি করে, অন্যদের উপহাস করে।
এই আয়াতের সঙ্গে কুরআনের আরেকটি আয়াত গভীরভাবে সম্পর্কিত—
“তারা যখন সরে গেল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরও সরিয়ে দিলেন।”
এখানে পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে— প্রথমে সরে গেল মানুষই। আল্লাহ এরপর তাঁর স্থাপিত নিয়ম কার্যকর করলেন। অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষের পছন্দের পরিণতি বাস্তবে রূপ দিলেন।


এটাই আল্লাহর সুন্নাহ— তাঁর চিরন্তন নিয়ম। মানুষ বীজ বোনে, আল্লাহ ফল ফলান। মানুষ পথ বেছে নেয়, আল্লাহ সেই পথের পরিণতি সৃষ্টি করেন।
এই নিয়ম আধুনিক জীবনে আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায় প্রযুক্তির জগতে। আজ আমরা সবাই “অ্যালগরিদম” শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম— সবই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।


ধরুন, একজন ব্যক্তি একদিন ভুল তথ্য বা ষড়যন্ত্রমূলক কোনো ভিডিও দেখল। পরদিন সে দেখবে— তার সামনে একই ধরনের আরও ভিডিও আসছে। একই চিন্তা, একই বিকৃতি, একই বিভ্রান্তি। কেন? কারণ সিস্টেম ধরে নিয়েছে— এটাই তার পছন্দ।
এখানে কেউ তাকে জোর করেনি। প্রথম ক্লিকটি সে নিজেই করেছে। কিন্তু একবার সে পথ বেছে নেওয়ার পর, অ্যালগরিদম সেই পথকেই আরও প্রশস্ত করে দিয়েছে। ধীরে ধীরে সে এমন এক তথ্যবুদবুদের মধ্যে ঢুকে পড়ে, যেখানে ভুলটাই তার কাছে একমাত্র সত্য বলে মনে হয়।
এটাই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন।


যে ভুলকে গ্রহণ করে— ভুলই তার সঙ্গী হয়ে যায়।
এটি কোনো শাস্তি নয়। এটি নিজের পছন্দের স্বাভাবিক পরিণতি।
এই আয়াতের সবচেয়ে বড় সতর্কতা এখানেই— মানুষ যখন ভুল পথে থেকেও নিজেকে সঠিক মনে করতে শুরু করে, তখন সে আর ফিরে আসতে চায় না। তার বিবেক নিভে যায়। আর বিবেক নিভে গেলে মানুষ নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে— অথচ বুঝতেই পারে না।


তবে কুরআন কখনো মানুষকে হতাশ করে না। একই সঙ্গে কুরআন আশার দরজাও খুলে দেয়। কুরআনের ঘোষণা অত্যন্ত স্পষ্ট— যে ফিরে আসতে চায়, তার জন্য পথ খোলা। যে চেষ্টা করে, তাকে পথ দেখানো হয়।
আল্লাহ বলেন— যারা আমার পথে চেষ্টা করে, আমি তাদের পথ দেখাই।
অর্থাৎ, আলো কখনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। আলো গ্রহণ করতে হয়। দরজা খুলতে হয়। জানালা খুলতে হয়।


যে মানুষ কুরআনকে জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে— তার চিন্তা পরিষ্কার হতে শুরু করে, তার বিবেক জাগ্রত হয়, তার সিদ্ধান্ত ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
আর যে মানুষ কুরআনকে সরিয়ে রাখে— তার চিন্তা ক্রমে বিকৃত হয়, তার আত্মতুষ্টি বাড়ে, তার ভুলগুলোই তার সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
এটাই ৪৩:৩৬ আয়াতের গভীর বিজ্ঞান।
এটি কোনো ভীতিকর ঘোষণা নয়। এটি বাস্তবতার এক নির্মম কিন্তু ন্যায়সঙ্গত বিবরণ। মানুষ কোন আলো বেছে নেবে— সেটাই ঠিক করে দেয়, তার সঙ্গী কে হবে

বিবেক নিভে গেলে শয়তান সঙ্গী হয়।।
মহামায়া আয়ুমী বাহাদুর, (ইংল্যান্ড)


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা